৫০ বছরপূর্তিতে ফিরে দেখা: বিশ্বে সাড়া জাগানো অনন্য উদ্যোগ ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’


আজিজুল পারভেজ


যুদ্ধের নির্মমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল সঙ্গীত। আয়োজন হয়েছিল একটি চ্যারেটি কনসার্টের। চ্যারেটি কনসার্টের ক্ষেত্রে এটি এখন মাইল ফলক উদ্যোগ হয়ে আছে। প্রথম বারের মতো আয়োজিত বৃহত্তম কনসার্টটি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। ১৯৭১ সালের সেই কনসার্টের পর আরো অনেক কনসার্ট আয়োজন হয়েছে বিশ্বে। কিন্তু বিশ্বের প্রথম সাড়া জাগানো বৃহত্তম চ্যারিটি কনসার্ট হিসেবে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ অনন্য।

১ আগস্ট ১৯৭১, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ব্রিটেনের বিখ্যাত রক ব্যান্ড বিটলসের লিড গিটারিস্ট জর্জ হ্যারিসন ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ভারতীয় সেতার কিংবদন্তী পণ্ডিত রবিশঙ্কর। তাদের আহবানে সেদিন মঞ্চ মাতিয়েছিলেন আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি ও ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত শিল্পীরা।

সত্তরে বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর নতুন করে জীবন গড়তে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন জর্জ হ্যারিসন। ১৯৭১ সালের জুন মাসে তাঁর নতুন অ্যালবাম ‘রাগা’র জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসে কাজ করেছিলেন। এ কাজে আরো যুক্ত ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। বাংলাদেশে তখন চলছে মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানিদের গণহত্যা, ধ্বংস আর নির্মমতা বিপর্যস্ত করে তুলে বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি সঙ্গীতজ্ঞ রবিশঙ্করকে। সেই সময়ে তিনি ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য জন্য তহবিল সংগ্রহে একটি কনসার্ট আয়োজনে পাশে চান জর্জ হ্যারিসনকে। নিজের অ্যালবাম ছাড়াও সামনে নতুন ব্যাড ফিঙ্গার এবং জন লেননের ‘ইমাজিন’ অ্যালবামে বাজানোর ব্যস্ত শিডিউল সত্ত্বেও রবিশঙ্করের আহবানে সাড়া দিলেন জর্জ হ্যারিসন নিজ দায়িত্ববোধ থেকে। শুধু তাই নয় কনসার্টের দায়িত্বই নিজ কাঁধে তুলে নিলেন।

জর্জ হ্যারিসন প্রথমে তার প্রাক্তন দল দ্য বিটলেসর সদস্যদের যোগ দিতে বলেন। কিন্তু পল ম্যাকার্টনি আসতে রাজি হন নি আর নানা কারণে জন লেনন ও মিক জ্যাগার যোগ দিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত বিটলসের একমাত্র রিঙ্গো স্টার যোগ দিতে সক্ষম হন। তাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখান বিশ্বখ্যাত মার্কিন সংগীতশিল্পী-গীতিকার [পরবর্তীতে নোবেল ও অস্কারজয়ী] বব ডিলান, সর্বকালের সেরা গিটার বাদকদের একজন ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী এরিক ক্ল্যাপটন, মার্কিন সংগীতশিল্পী বিলি প্রেস্টন আর লিওন রাসেল, জার্মান সংগীতশিল্পী ক্লাউস ভুরম্যান, ড্রামার জিম কেল্টনার ও হ্যারিসনের নতুন দল ব্যাড ফিঙ্গারের যন্ত্রীদলসহ অনেকে। ‘ইমাজিন’ গানের অমর শিল্পী জন লেনন অনুষ্ঠানের আসার আগ্রহ দেখালেও এক সপ্তাহ আগে তাঁর অপারগতার কথা জানান।

বিটলস্‌ ভেঙে যাওয়ার পর এই অনুষ্ঠানই ছিল হ্যারিসনের সরাসরি অংশগ্রহণ করা প্রথম অনুষ্ঠান। এরিক ক্ল্যাপটনও এই অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে প্রায় পাঁচ মাস পর কোনো সরাসরি অনুষ্ঠানে গান গাইলেন। বব ডিলানও ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবারের মতো শ্রোতা দর্শকদের সামনে এলেন।

সঙ্গীত জগতের অসামান্য কিছু নক্ষত্র সেই কনসার্টে গান গাইলেও তারা কেউ কোনো পারিশ্রমিক নেন নি। মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে অনুষ্ঠানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।

জর্জ হ্যারিসন কীভাবে জড়ালেন ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে তা বিস্তারিত লিখেছেন নিজের আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘আই মি মাইন’-এ। তুমুল ব্যস্ততার মধ্যেও যে কনসার্টটি সফল হয়েছিল সেকথাও জানিয়েছেন তিনি। তিনি লিখেছেন, ‘সামান্য মহড়াই আমরা করেছিলাম। সত্যি বলতে কি, সবার উপস্থিতিতে একটা মহড়া আমরা করতে পারি নি। নানা অসুবিধার মধ্যে অগোছালোভাবে কাজটা করলাম আমরা।…তারপর কনসার্ট করলাম আমরা। দুটি অনুষ্ঠান করেছিলাম। প্রথম অনুষ্ঠানের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয় কনসার্টটি করেছিলাম। কপালই বলতে হবে, সবকিছু ভালোয় ভালোয় সম্পন্ন হয়েছিল।’

১ আগস্ট ১৯৭১, দিনটি ছিল রবিবার। ২০ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতার বিশালাকৃতির ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অপরাহ্ন ২.৩০ ও রাত ৮ টায় দুইটি শো অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিতি ছিল প্রায় ৪০ হাজার দর্শক।

কনসার্টের শুরুতে পণ্ডিত রবিশঙ্কর বলেন, ‘প্রথমভাগে ভারতীয় সংগীত থাকবে। এর জন্য কিছু মনোনিবেশ দরকার। পরে আপনারা প্রিয় শিল্পীদের গান শুনবেন। আমাদের বাদন শুধুই সুর নয়, এতে বাণী আছে। আমরা শিল্পী, রাজনীতিক নই। তবে বাংলাদেশে আজ যে তীব্র যন্ত্রণা, বেদনা ও দুঃখের ঘটনা ঘটছে, আমাদের সংগীত দিয়ে আমরা তা আপনাদের উপলব্ধি করাতে চাই। আমরা তাদের কথাও উপলব্ধি করাতে চাই, যারা বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী হয়ে ভারতে এসেছে।’

সেতারবাদক রবিশঙ্কর ও বিখ্যাত সরোদবাদক ওস্তাদ আলি আকবর খান যন্ত্রসঙ্গীতের যুগলবন্দীর মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু করেন। তাদের সাথে তবলায় ছিলেন ওস্তাদ আল্লা রাখা খান এবং তানপুরায় কমলা চক্রবর্তী। তারা এই কনসার্টের জন্য রবিশঙ্করের তৈরি ‘বাংলা ধুন’ (ধুন হলো এক বা একাধিক রাগের মিশ্রণে সৃষ্ট সুর) নামে একটি ধুন পরিবেশন করেন। যা তারা পিনপতন নীরবতায় ১৭ মিনিট ধরে পরিবেশন করেন। এরপর মঞ্চে ওঠেন কনসার্টের বড় আকর্ষণ জর্জ হ্যারিসন। তিনি তাঁর জনপ্রিয় অ্যালবাম ‘অল থিংস্ মাস্ট পাস’ থেকে গান পরিবেশন করেন। গান গেয়েছিলেন আটটি। এর একটি ছিল কনসার্টের আরেক বড় আকর্ষণ প্রতিবাদী গানের শিল্পী বব ডিলানের সঙ্গে। এরপর রিঙ্গো স্টার ও বিলি প্রেস্টন একটি করে গান করেন। লিওন রাসেল একটি একক এবং ডন প্রেস্টনের সঙ্গে একটি গান করেন। বব ডিলান গেয়েছিলেন পাঁচটি গান। শিল্পীরা দুটি শোতে ভিন্নক্রমে একই গান পরিবেশন করেন।

অনুষ্ঠানের শেষ পরিবেশনা ছিল জর্জ হ্যারিসনের সেই অবিস্মরণীয় গান ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’। এই কনসার্টের জন্য গানটি লিখেছিলেন ও সুর করেছিলেন জর্জ হ্যারিসনের নিজেই। হ্যারিসন ‘বাংলাদেশ’ শব্দটা উচ্চারণ করতে পারতেন না ভালোভাবে। উচ্চারনটা হয়ে যায় ‘ব্যাংলাদেশ’, ‘ব্যাংলাদেশ’। কিন্তু সেই ভাঙা ভাঙা উচ্চারনেই বহুদূরের একটা অজানা অচেনা দেশের মানুষের জীবন বাঁচাবার জন্য, অসামান্য মমতা আর অকল্পনীয় আকুতি ছিল তার কণ্ঠে। উচ্চ স্বরে হূদয়স্পর্শী কণ্ঠে গাইলেন—‘মাই ফ্রেন্ড কেম টু মি উইথ স্যাডনেস ইন হিজ আইজ, টোল্ড মি দ্যাট হি ওয়ানটেড হেল্প বিফোর হিজ কান্ট্রি ডাইজ…।’

‘বাংলাদেশ’ গানটি দারুণ আলোড়ন তোলে। তার আবেগময় কণ্ঠের ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ নামটি রাতারাতি পৌঁছে যায় মার্কিন মুলুকের জনগণসহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে। সেই গান অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরিতে।

জানা যায়, এ কনসার্টের মাধ্যমে ২০ হাজার ডলার সংগ্রহের কথা ভেবেছিলেন হ্যারিসন ও রবিশঙ্কর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কনসার্ট ও অন্যান্য অনুষঙ্গ থেকে প্রাপ্ত অর্থ সাহায্যের পরিমাণ ছিলো প্রায় আড়াই লাখ ডলার [২,৪৩.৪১৮মার্কিন ডলার]। এ অর্থ ইউনিসেফের মাধ্যমে শরণার্থীদের সাহায্যার্থে ব্যয় করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে এ ধরনের বড় একটি অনুষ্ঠান বিশ্বে প্রথমবারের মতো হয়েছিল। তারপর আফ্রিকার ক্ষুধার্তদের জন্য বা অন্য কোনো বিষয়ে বিশ্বের নানা দেশে নানা বিষয়ে বড় বড় কনসার্ট হয়েছে। কিন্তু ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর যে ব্যাপক প্রভাব, সেটা অন্য কোনোটির ক্ষেত্রে হয় নি। জর্জ হ্যারিসন লিখেছেন, ‘মোদ্দা কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের ঘটনাবলির ব্যাপারে আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমরা যখন কনসার্টের প্রস্তুতি নিচ্ছি, মার্কিনরা তখন পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠাচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মৃত্যু হচ্ছে, কিন্তু সংবাদপত্রে শুধু কয়েক লাইন, ‘ও, হ্যাঁ, এখনো এটা চলছে।’ আমরা ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছিলাম।’ আর পণ্ডিত রবিশঙ্কর ২০০৫ সালে প্রকাশিত ডিভিডির ভূমিকায় বলেছেন, ৭৫ বছরের সংগীতজীবনে যত কনসার্ট করেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ওই কনসার্টটিই।

৪০টি মাইক্রোফোনে অনুষ্ঠানের গান ও কথা রেকর্ড করে তিনটি লং প্লেয়িং নিয়ে একটি বড় অ্যালবাম ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ প্রকাশ করা হয় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে। এটি ছিলো বব ডিলানের প্রথম সরাসরি গানের প্রকাশনা। এরপর ১৯৭২ সালের মার্চে কনসার্ট নিয়ে নির্মিত হয় ফিল্ম। ১৯৭৩ সালে যা বেস্ট অ্যালবাম হিসেবে জিতে নেয় গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড। এ সব বিক্রি থেকে প্রাপ্ত আয় ব্যয় করা হয় ইউনিসেফ পরিচালিত শিশুদের কল্যাণমূলক তহবিলে। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত অ্যালবামটির সিডি সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। পুনঃপ্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। এই কনসার্টের প্রভাব এতই সুদূরপ্রসারি যে, ৩০ বছর পরও সেই কনসার্টের ডিভিডি প্রকাশিত হয়। ২০০৫ সালে নতুন করে প্রকাশিত হয় ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এর তথ্যচিত্র। দুটি ডিভিডির একটি সেটের একটিতে রয়েছে পুরো গানের অনুষ্ঠান। আরেকটিতে শিল্পী-কলাকুশলীদের সাক্ষাৎকার, কনসার্ট আয়োজনের নেপথ্য কাহিনি, মহড়ার চিত্র ও কিছু গান। সঙ্গে আছে একটি সচিত্র পুস্তিকা। এই ডিভিডি বিক্রির অর্থ যায় জর্জ হ্যারিসন ফান্ড ফর ইউনিসেফে।

চ্যারিটি কনসার্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে বিশ্বে অনন্য দৃষ্ঠান্ত হয়ে আছে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। রূপকথার গল্পের মতো ছিল সেই আয়োজন। এই কনসার্টের মাধ্যমে একটি দেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে গেলে একদল মানবতাবাদী শিল্পী। বিশেষ করে পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসন। সেই সঙ্গে অমর হয়ে রইল একটি গান—গভীর মানবিক আবেদন নিয়ে উচ্চ স্বরে করুণ বিলাপের সুরে জর্জ হ্যারিসন গেয়েছিলেন ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’। ‘বন্ধু আমার এল একদিন/ চোখভরা তার ধু ধু হাহাকার/ বলল কেবল সহায়তা চাই/ বাঁচাতে হবে যে দেশটাকে তার/ বেদনা যদি বা না-ও থাকে তবু/ জানি আমি, কিছু করতেই হবে/ সকলের কাছে মিনতি জানাই আজ আমি তাই/ কয়েকটি প্রাণ এসো না বাঁচাই/ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ/ দেখছি সেখানে সকলই ধ্বস্ত/ কত শত প্রাণ মরে নিঃশেষ/ দেখিনি এমন বেদনা অশেষ/ তোমরা সবাই দুহাত বাড়াও আর বুঝে নাও/ মানুষগুলোকে সহায়তা দাও/ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ…’।

‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ গানের সুর আজও মানুষকে উজ্জীবিত করে। গানটি শোনার পর এখনো শ্রোতার হূদয় আবেগমথিত হয়, চোখের কোণে পানি জমে ওঠে।


লেখক: সাংবাদিক-সংস্কৃতিকর্মী। বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ।

Share With:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Start typing and press Enter to search