মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ

রুনু দাশ


‘৭১-এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ এর ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন – প্রত্যেক ঘরে ঘরে যার যা কিছু আছে তা দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে। এরপর থেকেই ব্যাপকভাবে ছাত্র, যুবক, নারী, তরুন- সহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষ মিটিং মিছিল করে সমবেত হতে থাকে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালির সংগ্রাম আরো শক্তিশালী ও তীব্র হয়ে ওঠে। মিছিল মিটিংয়ে ঢাকার রাস্তা হয়ে ওঠে সরগরম। মরিয়া হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে হাজার হাজার ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গর্জে ওঠে হানাদারদের মেশিনগান, ট্যাংক, ঝাঁকে ঝাঁকে রাইফেলের গুলির আওয়াজ। আগুনের লেলিহান শিখায় রাতের আকাশ হয়ে ওঠে লালে লাল। রাস্তাঘাট ভরে যায় লাশের স্তুপে। পাকহানাদারদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এর মধ্যেও ছাত্র, জনতা, পুলিশ, ইপিআর শত্রুর বিরুদ্ধে গড়ে তোলে প্রতিরোধ। মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে সকল মুক্তিকামী মানুষ। ঢাকাসহ দেশের সকল এলাকা আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে। হাজার হাজার জনতা মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণে যোগ দেয় এবং প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ছাত্র, যুবক, কৃষক, শ্রমিক, নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার হাজার হাজার জনতা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি বরিশালের গৌরনদী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী। তখন কলেজ বন্ধ থাকার কারণে আমি ধামুরায়, গ্রামের বাড়িতে। ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হিসেবে কিছু করার তাগিদ মনে থাকলেও প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলের অল্প বয়সের মেয়ে, তাই কিছু প্রকাশ করার উপায় ছিল না। এছাড়া তখন গ্রামের সকল মানুষের মধ্যে একটা ভীতি ও আতঙ্ক ছিল। প্রতিদিন সকাল হলেই কখন যেন আর্মি গানবোট আসলো, কাকে ধরে নেবে, কাকে মারবে – এই আতঙ্কে মানুষ দিশেহারা। সন্ধ্যা নামতেই ডাকাতির নামে রাজাকার আলবদরদের অত্যাচারে ভয়ে সকল মানুষের রাত কাটত। সে ছিল এক ভয়ানক অভিজ্ঞতা। নিজের চোখে না দেখলে বর্ণনায় বোঝানো সম্ভব নয়। আমাদের বাড়িতে তখন আত্মীয়-অনাত্মীয় ও আশেপাশের গ্রামের ৮/১০ টি পরিবারের লোকজন সহ ৪০/৫০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। বাড়িতে এতগুলো আশ্রিত মানুষের মান-সম্মান রক্ষা করার ও তাদের নিরাপত্তার চিন্তায় আমার মা-বাবা সর্বদা চিন্তিত থাকতেন। এমন পরিস্থিতিতে মা-বাবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা, তাদের ছেলেমেয়ে-স্ত্রীসহ ৩৫ জনের দলে আমি ও আমার দুটি ছোট ভাইকে নিয়ে পায়ে হেঁটে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, রাতে কোনো বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে, কোনোদিন স্কুলের ছাদে রাত কাটিয়ে ১১ দিনের মাথায় ভারতের বর্ডারে পৌঁছালাম। যাবার পথে গৌরনদীর কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে পরিচয় হয়ে মনে কিছু শক্তি ও সাহস বাড়ল। তাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম ২৫ মার্চের কালরাত্রে পাক-হানাদারদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া ছাত্রনেতা কালীরঞ্জন শীল এই মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ভারতে পৌঁছার কয়েকদিন পরে আমি বশিরহাটের টাকি মহিলা যোদ্ধা ক্যাম্পে থেকে আমি ৯নং সেক্টরে মেজর জলিলের অধীনে মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র ট্রেনিং গ্রহণ করি। ট্রেনিংয়ে আমাদের ছোটবড় সকল ধরনের অস্ত্র চালানো, বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরকের ব্যবহারসহ এসএমজি, শর্ট মেশিনগান, স্টেনগান, এসএলআর, থার্টিসিক্স গ্রেনেড চালানো ও গেরিলা পদ্ধতিতে ট্রেনিং দিয়েছেন সুবেদার মাজেদুল হক। সারাদিনের ট্রেনিংয়ে অনেক পরিশ্রমের পরও তরুণ বয়সে তা ছিল অন্যরকম অভিজ্ঞতা।

মাঝেমধ্যে নৌকায় চেপে আমরা দেবাহাট যেতাম। সাথে থার্টি সিক্স গ্রেনেড থাকত। দেবাহাট থানায় যেখান বর্ডার আউটপোস্টে ইপিআর ও বিজিবির ক্যাম্প ছিল। ট্রেনিংরত অবস্থায় ছদ্মবেশে পাকিস্তানি সেনাদের খবর নিতে আমাকে একবার সাতক্ষীরা যেতে হয়েছিল। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাবার অবস্থা। যেতে যেতে মনে হয়েছিল যদি আর ফিরতে না পারি, ধরা পড়ে যাই! তাহলে আমার ছোট ভাই দুটির কী হবে! কে নেবে ওদের দায়িত্ব! ঘরে ফিরে আগে ওদের দু’জনকে জড়িয়ে ধরে মনের ভীতি কাটালাম।

সারাদিন কাটত আর্মস ট্রেনিংয়ে। দুপুরে একটু খাবার সময় থাকত। বর্ডার এলাকায় আমাদের ক্যাম্প, সারারাত মর্টারের শব্দ। প্রথম প্রথম খুব ভয় লাগত। মাঝে মাঝে টাকি ও ইছামতী নদীর পারে গিয়ে ওপারের বাংলাদেশ দেখতাম। নদীর পারে শত শত মাথার খুলি পড়ে আছে। এগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত পাকবাহিনী ও আলবদরদের মাথার খুলি। ট্রেনিংয়ে আমার সাথে বাহিনী প্রধান রমা দাশ, বিথীকা বিশ্বাস, কল্পনা, মিনতি, শোভাসহ মোট ১৮ জন মেয়ে ছিল।

জহির রায়হানের স্টপ জেনোসাইড, লেট দেয়ার বি লাইট ও নাইন মান্থ ড়– ফ্রিডম ডকুমেন্টারিতে আমার ট্রেনিংয়ের সময়কার ছবি রয়েছে। স্বাধীনতার পরে এই ডকুমেন্টারিগুলো সম্পর্কে জানতে পেরেছি।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গঠিত হবার পর ভারতীয় মিত্র বাহিনী এবং গেরিলা বাহিনীর অপারেশন শুরু হওয়ায় ঢাকা সহ সারাদেশে পাকহানাদার বাহিনী বেকায়দায় পড়তে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা ক্রমেই বিজয়ের পথে এগিয়ে যেতে থাকে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ডিসেম্বর মাসে বিজয় অর্জিত হয়। মুক্তিবাহিনী একের পর এক এমনভাবে আক্রমণ শুরু করে যে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে ১৩ হাজার সৈন্যসহ পাকিস্তানি সেনাপ্রধান জেনারেল নিয়াজী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কমান্ডারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। দেশ হয় শত্রুমুক্ত। কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধাদের জয় বাংলা স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালি জাতির লাল-সবুজের পতাকা খচিত সোনার বাংলাদেশ।

মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উৎযাপনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, মানবিক বাংলাদেশ গড়ায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ গোটা বাঙালি জাতি। এছাড়া স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে সরকারিভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি চ‚ড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকা যাতে স্বচ্ছ ও নির্ভুল হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা সঠিকভাবে সকল মুক্তিযোদ্ধার হাতে পৌঁছায়, সরকারের কাছে আমার এই প্রত্যাশা।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা

7 Views

Leave a Comment

Your email address will not be published.