ভালোবাসার ২৬

শাহ্ জে. চৌধুরী


ছেলেবেলায় আমরা স্কুলের বইতে নদীর স্রোতের সঙ্গে সময়ের তুলনা পড়েছিলাম, ‘সময় চলিয়া যায় / নদীর স্রোত প্রায়’। জীবনের এই অংশে এসে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখি পাঠ্য বই কি দারুণভাবে নির্ভুল! আমার দাম্পত্য জীবনটা পঁচিশ পেরিয়ে ছাব্বিশ বছর বসে পৌঁছে গেল। দু’জন মানুষ নানান স্বপ্ন দেখে, পরিকল্পনা করে, একসঙ্গে থাকবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ছাব্বিশ বছর আগে জীবন শুরু করেছিল। তারপর জীবনের কত চড়াই গেল, কত উৎরাই গেল, কত উত্থান, কত পতন, আরো আরো স্বপ্ন, তার সঙ্গে স্বপ্ন ভঙ্গও আছে। সেসব আনন্দ বেদনা নিয়ে মানুষ দু’জন ছাব্বিশ বছর ধরে একসঙ্গেই আছে। কেবল আছে নয়, আঁকড়ে আছে পরস্পরকে। আছে আবেগে, বেগে, নিন্দায়, ভালোবাসায়।

সম্পর্কটা মানুষে মানুষে গড়ে ওঠে। আবার কিছু সম্পর্ক আছে গড়ে নিয়েই মানুষ পৃথিবীতে আসে। যেমন বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয় যারা, তাদের সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধনটা পারিবারিক। ‘সম্পর্ক’ একটা অদ্ভুত ব্যাপার। এই অদ্ভুত ব্যাপারটি মানুষ খুব আগ্রহ করে ঘটিয়ে চলে। ঘটাতেই থাকে। আমৃত্যু। এক জীবনে একটা মানুষ কত শত মানুষের সঙ্গে যে সম্পর্কিত হয়! কেননা মানুষ একলা থাকতে পারে না। একলা থাকতে সে চায়ও না। একলা সে নয়ও। তার বাবা থাকে, মা থাকে ভাই থাকে, বোন থাকে, বন্ধু থাকে – কিন্তু দরকার তার নিজের মতো একজন মানুষ। কোটি মানুষের ভিড়ে সে একান্ত নিজের মানুষটিকে খুঁজতে থাকে, খুঁজে বেড়ায়। সকলেই পায় না হয়ত। আবার পেয়েও যায় কেউ কেউ, অনেকেই। আমি সে অনেকের একজন। আমি সৌভাগ্যবান।

সম্পর্ক মানেই হলো ভালোবাসার বন্ধন। সকল সম্পর্কই। সে কারণেই সম্পর্ক ব্যাপারটা হলো মানুষের অভ্যন্তরের অনুভুতি প্রকাশের অভিপ্রায়। সম্পর্ক নির্মাণের ভিত্তিটি তাই অনেক কিছুর ওপরই নির্ভর করে। এর নির্ভুল ছাঁটের কোনো সংজ্ঞা নেই আসলে। গতানুগতিক কোনো সংজ্ঞা দিয়েই সম্পর্ককে বোঝানো যায় না তাই। এ কারণে সম্পর্কর আমরা নাম দিই। নানান রকম নাম। আজকে যে সম্পর্কটির কথা বলতে বসেছি তার নাম ‘দাম্পত্য’।

‘দাম্পত্য’ নামে সম্পর্কটি গড়ে ওঠে দু’জন মানুষের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে। বিয়ে তো একটি সামাজিক বন্ধন। বস্তুত এই বন্ধনটিই মানুষের জীবনকে পূর্ণতা দেয়। পূর্ণতা দিয়েছে আমার জীবনকে, আপনার দিয়েছে জীবনকেও। দিয়েছে আমার জীবনকেও। তবে সকলে যে আমার এই কথাটি মেনে নেবেন – সেও সত্যি নয়। অনেকেই দাবি করেন বিয়ে নামক সম্পর্কে জড়িয়ে তিনি অসুখি হয়েছেন। তাঁদেরকে সন্মান জানিয়ে বলি, এইটি আসলে উপলব্ধি। এ উপলব্ধি মানুষের সুখের উপলব্ধি। একইভাবে দুঃখেরও বটে। সুখের বিষয়, আমার উপলব্ধিটি সুখের সঙ্গেই সম্পর্কিত।

আমার ছাব্বিশ বছরের সুখের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন উপাদান, দু দু’টি মেয়ে আর একটি পুত্র সন্তান। তারা পৃথিবীতে এসেছে, একটু একটু করে বেড়ে উঠেছে- এই বেড়ে ওঠা দেখবার অনুভূতিটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুভূতি। এই অনুভূতি আমাকে উপলব্ধি করিয়েছে মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ কেন লিখেছিলেন।

দেবী অন্নপূর্ণা ছদ্মবেশে নদী পার হতে এলেন। মাঝি ঈশ্বরী তাকে নৌকায় তুলল। অন্নপূর্ণা নৌকায় উঠে কাঠের তৈরি পানি সেচবার পাত্রটিতে পা রেখে বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে সে কাঠের পাত্রটি সোনায় রূপান্তরিত হয়ে গেল। ঈশ্বরী বুঝে ফেলল ইনি তো সাধারণ কেউ নন! নিশ্চয়ই কোনো দেবী!

অন্নপূর্ণা তখন ছদ্মবেশ ছেড়ে বললেন, তুমি কী বর চাও বলো।

বর মানে তো যা চাইবে তা-ই পাবে। মাঝি তখন সন্তানদের মায়ের মনোবাঞ্ছার কথাটিই দেবীকে বলে দিল, ‘প্রণামিয়া পাটনী কহিছে জোড় হাতে/ আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’

সন্তানকে দুধে ভাতে রাখতে চাওয়া কামনাটির অর্থ হলো সন্তানের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবার আকাক্সক্ষা। এইটি আসলে চিরন্তন। পৃথিবীর সকল বাবা মায়ের অন্তরের কথা। পৃথিবীর সকল বাবা-মায়েরাই চান সন্তানটি তার নিরাপদে থাকুক, নির্ভাবনায় থাকুক, কোনো অশুভ যেন তাকে কখনো ছুঁতে না পারে। এই চাওয়া থেকে বাবা-মা জীবনকে তুচ্ছ করে সন্তানকে গড়তে থাকেন। সন্তানের জন্যে গড়তে শুরু করেন। আমার আপনার যা কিছু অর্জন তার সবই তো আমাদের সন্তানদের জন্যেই, তাই নয়? এই যে পরিশ্রম করে অর্জন এবং সন্তানদেরকে জন্যে অকাতরে সব দিয়ে দেয়া- সম্পর্কের জন্যেই তো। সম্পর্কটির ভিত্তি ভালোবাসা বলেই।

দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ অনুভূতিটি আমার স্ত্রীর সঙ্গে যাপিত জীবন। স্ত্রী শব্দটির অভিধানগত অর্থটি হলো- নারী। কিন্তু প্রচলিত ভাষায় স্ত্রী হলেন ভার্যা। মানে পতœী। অভিধান আরও বলছে, ধারাবাহিক বৈবাহিক সম্পর্কের নারী অংশীদার। অপরটি তবে পুরুষ অংশীদার। ‘অংশীদার’- তারমানে বিয়ে তো কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। বিয়ে একটা অংশীদারিত্বভিত্তিক সম্পর্ক। যার নিয়ামক আস্থা, বিশ্বাস, নির্ভরতা এবং ভালোবাসার পূর্ব শর্ত। এই যে এক সঙ্গে এতগুলো বছর রয়েছি আমরা সে জোর তো ভালোবাসারই।

দু’জন মানুষ আপনাপন জীবনকে অপরজনের সঙ্গে ভাগ করবেন বলে স্বেচ্ছায় চুক্তিবদ্ধ হলেন। বিয়ে মানুষের জীবনের প্রধানতম ধাপগুলোর অন্যতম। একারণেই কেউ বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হলে আমরা বলি, নতুন জীবন শুরু করল। যদিও জীবন তো সে-ই। মানুষ দু’জনও তাই। কেবল ‘বিয়ে’ নামের সম্পর্কটি নতুন। বলা হয়ে থাকে বিয়ে একটা স্বর্গীয় ব্যাপার। সৃষ্টিকর্তা নিজেই এই সম্পর্ক নির্ধারণ করে দেন। সেকারণেই কার সঙ্গে কে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হবেন সেটি কেউই জানতে পারেন না। তবে সম্পর্কের মানুষটি যদি ভুল মানুষ হন, তবে স্বর্গে নির্মাণ হওয়া সম্পর্কটি আর মোটেই স্বর্গীয় থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে ‘নারকীয়’।

তারুণ্যে আমার এক বন্ধুকে দেখেছি এক তরুণীকে দেখে ভীষণ রকম উন্মাদ হয়েছিল। উন্মাদ যে হয়েছে সেকথা সে মেয়েটিকে জানিয়েও দিয়েছিল। এরপর মেয়েটি বন্ধুর উন্মাদনাকে গ্রহণও করে ফেলল। আমরা দেখলাম, বেশ ভালোভাবেই গ্রহণ করল। মেয়েটির গায়ের রঙ কৃষ্ণবর্ণ ছিল বলে মেয়েটিকে বন্ধু ডাকত ‘কালো পুষ্প’। সুযোগ পেলেই দু’জনে ঢাকার আশপাশে বন্ধুদের বাড়ি চলে যায়। সেখানে শরীরে শরীর লাগিয়ে সেঁটে থেকে হেঁটে বেড়ায়, বসে, নৌকোয় করে ঘুরে বেড়ায় আর গুটুরগুটুর করে কিসব কিসব বলে। বন্ধুটা সুযোগ পেলেই কালো পু®পর চুলে নাক ডুবিয়ে বসে থাকে। আমরা দেখে দেখে হাসি আর রসিকতা করি। সেসব রসিকতা সে শুনতে পায় না। চোখেমুখে মুগ্ধতা ছড়িয়ে কালো পু®েপর চুলে গন্ধ বর্ণনা বলতে থাকে। দু’জনে স্বপ্ন বোনে। ঘর বাঁধার স্বপ্ন। স্বপ্নে ঘর বেঁধেও ফেলে। আসবাবপত্র কেনে, ঘর সাজায়, বাজার রান্না সবই করে। তারপর হঠাৎ কালো পু®প আর দেখা করতে আসে না। আসেই না। অপরূপ সৌন্দর্য মাখা কালো পু®প মেয়েটা টেকো মাথার একটা লোককে বিয়ে করে তার সঙ্গে সংসার করতে চলে যায়। বন্ধুটি আঘাতে এলোমেলো হয়ে যায়। খুব এলোমেলো।

কালো পু®প এখন দুই পুত্র সন্তানের জননী। বড় ছেলেটি ক্লাস নাইনে উঠবে। আমার বন্ধুটির সঙ্গে এখনো তার মাঝেমধ্যে কথা হয়। ভালো নেই কালো পুস্প। ভুল করা ভুলের জন্যে খুব কাঁদে মেয়েটা। কিন্তু সে ভুল শোধরাবার উপায়টি গেছে বিলুপ্ত হয়ে। বন্ধুর বুক মুচড়ে ওঠে। ব্যথা হয় তার বুক। এখন আমার বন্ধু আর কালো পুস্প- দু’জনের কেউই ভালো নেই। দু’জনেরই বুক জুড়ে পেয়ে হারিয়ে ফেলার ব্যথা, যন্ত্রণা। তাদের দাম্পত্য জীবন স্বর্গীয় নয়।

আমার ক্ষেত্রে সম্পর্কটি তেমন হয় নি। মানুষের বিভিন্ন অনুভূতির ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। ভালোবাসাও একটি অনুভূতির নাম। মানুষের জীবনে সবচেয়ে কাংক্ষিত অনুভূতি। অনুভূতিকে কখনো দেখা যায় না। এটি শুধুই অনুভবের। আমার স্ত্রী, পত্নী, ভার্যা মানুষটি হলেন আমার ভালোবাসার অনুভূতিটির বাস্তব স্বরূপ।

বৈবাহিক সম্পর্কটি মানুষের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, বিয়ে মানুষের জীবনের প্রধানতম ধাপ। এই মানুষটির সঙ্গে যখন আমার পরিচয়, তখনই, সঙ্গে সঙ্গেই আমি সিদ্ধান্ত উপনীত হই, আমার জীবন সংসারের নারী অংশটি এই নারীটিই হবেন। ততক্ষণে তিনিও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁর জীবন সংসারের পুরুষ অংশটি আমিই হবো। ওই শুরু আমাদের অংশীদারিত্বের। তারপর তারপর কত কত চড়াই উৎরাই বন্ধুর পথ অতিক্রম করে আমরা সত্যি সত্যি পরস্পরের জীবনের অংশীদার হয়ে গেলাম।

আগেই বলেছি, আমাদের অংশীদারিত্বের অংশীদার এখন বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের তিনটি সন্তান। সম্পর্ক শব্দটির ভেতর লুকিয়ে থাকে হাজারও অর্থ। ‘সম্পর্ক’ শব্দটি আমাদের জীবনে চলতি পথের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই শব্দটি গড়ে মায়া, আনে টান আর প্রকাশে অনুভূতি- ভালোবাসা।

প্রযুক্তির এই যুগ আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় ‘সম্পর্ক’ কি হারিয়ে যাচ্ছে নাকি? অনেকেই ‘হ্যাঁ’ বোধক ভঙ্গিতে হতাশা ফুটিয়ে মাথা নেড়ে সায় জানাবেন। আমি তাদের কথা মানবো না। সম্পর্কের ভিত্তিটি তো ভালোবাসার। সে সম্পর্ক যখন অনুভূতিকে নাড়া দেবে সেখানেই ভালোবাসার উৎপাদন। ভালো তো মানুষকেই বাসে। মানুষ মানেই মানবিক। যেখানে মানবতা সেখানেই ভালোবাসা। ভালোবাসা যেখানে সেখানেই জীবনের জয়গান, আর প্রাণের ঝংকার। আজও তাই মানুষ ভালোবাসে, ঘর ছেড়ে ঘর বাঁধে। ভালোবাসার মানুষে বুঁদ হয়ে জীবন কাটায়। এই যেমন আমি- ছাব্বিশটি বছর বুঁদ হয়ে পার করে দিলাম অথচ মনে হয়, এইত সেদিন!…

Share With:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Start typing and press Enter to search