চরিত্র

মুবিন খান


আপনারা বিলি গ্রাহামকে চেনেন? বিলি গ্রাহামকে না চিনলেও তার কথাবার্তাকে চিনবেন। ‘হোয়েন ওয়েলথ ইজ লস্ট, নাথিং ইজ লস্ট; হোয়েন হেলথ ইজ লস্ট, সামথিং ইজ লস্ট; হোয়েন ক্যারেকটার ইজ লস্ট, অল ইজ লস্ট।’ বিলি গ্রাহামের এই কথা বাণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। বিলি গ্রাহাম ছিলেন একজন ধর্মপ্রচারক। আমেরিকান। ১৯৪৯ সালের পর বিলি গ্রাহাম বেশ বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি এমনি অনেক বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন যেগুলো বাণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। তার আরেকটি বাণী হলো, ‘মাই হোম ইজ ইন হ্যাভেন, আই’ম জাস্ট র্ট্যাভেলিং থ্রু দ্য ওয়ার্ল্ড’ কিংবা ‘করেজ ইজ কন্টাজিয়াস।’

প্রশ্ন হলো, আমার বাড়ি স্বর্গে অথবা সাহস সংক্রামক- এইসব বাণীর চাইতে ‘চরিত্র গেল তো সব গেল’ বাণীটি কেন এত জয়প্রিয় হলো?

ছেলেবেলায় দেখা একটা হিন্দি সিনেমার চটুল গানেও এই বাণীর ব্যবহার দেখেছিলাম। ব্যবহারের এই চটুলতা আবেগপ্রবণ বাঙালি মননেও আসন গেড়ে বসেছে। সমাজেও এর বিস্তার শেকড় ছড়িয়েছে। চরিত্রর এই স্খলন একটা দিককেই নির্দেশ করছে, সেটা পুরুষ যদি গোপনে নারীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, অথবা নারী যদি গোপনে পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে তাহলে চরিত্রে সমস্যা আছে। মানে হলো, চরিত্র আর চরিত্রর জায়গায় নাই। হীন হয়ে গেছে।

আসুন দেখি পাঠ্য বই চরিত্র বিষয়ে ছেলেমেয়েদের কী শেখায়। এসএসসি-এইচএসসির পাঠ্য বইয়ে চরিত্র নিয়ে রচনা আছে। সেখানে ভূমিকায় লিখেছে, সৃষ্টির ঊষালগ্নে মানুষ সভ্য জীবন যাপন করত না। নানা বৈরী পরিবেশ ও হিংস্র জীব জন্তুর সাথে যুদ্ধ করে তাদের বেঁচে থাকতে হতো। তাছাড়া মানুষে মানুষে গোত্রে গোত্রেও সংঘাত লেগেই থাকত। তাই হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি ছিল মানুষদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সেসময় পশুর সাথে মানুষের পার্থক্য ছিল না বললেই চলে। কিন্তু কালক্রমে মানুষের আচরণ থেকে পশুত্ব ঘুচে যায়। মানুষ ক্রমাগত চর্চার ফলে অর্জন করে নানা মানবীয় গুণাবলী। এসব মানবীয় গুণের সমষ্টিই হচ্ছে চরিত্র।

কঠিন সব কথাবার্তা। এর মানেটা কি দাঁড়াল তবে? আসুন আরেকটু দেখি।

চরিত্রর বৈশিষ্ট্য শিরোনাম দিয়ে লেখা আছে, ‘মানুষের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ গুণাবলী যেমন সত্যবাদিতা, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ, শৃঙ্খলা, মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, সাহসিকতা ইত্যাদি একত্রে মিলিত হয়ে কোনো ব্যক্তি হয়ে ওঠে চরিত্রবান।’

তাহলে দেখা যাচ্ছে কেউ যদি মিথ্যাচার করে কিংবা অসৎ হয় তাহলেও তার চরিত্র সমস্যায় আক্রান্ত ধরে নিতে হবে। মানুষের সঙ্গে শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ করলে, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ধারণ না করলেও তাকে চরিত্রহীন ধরে নেওয়া যেতে পারে।

ক’দিন আগে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটি আলোচনায় এসেছিল। হাতের কাছে বইটি নেই বলে ইন্টারনেটে খুঁজতে গিয়ে বেশ অবাকই হওয়া লাগল। কম করে হলেও ‘চরিত্রহীন’ বইটির পনের রকম প্রচ্ছদ পাওয়া গেল। প্রত্যেকের ‘চরিত্র’-ই ‘হীন’ হয়েছে কিনা জানি না তবে প্রচ্ছদে প্রত্যেক প্রকাশকই আপনাপন চারিত্রিক রুচি তুলে ধরেছেন। আমার খুব মজা লাগল। আমি মূল বই রেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ‘চরিত্রহীন’র প্রচ্ছদ চরিত্র দেখতে লাগলাম। সেসবের রঙ রূপ রস গন্ধ সত্যিই প্রবল উৎসাহ উদ্দীপক।

আচ্ছা কেউ কী বলতে পারেন, সত্যবাদিতা, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ, শৃঙ্খলা, মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, সাহসিকতা এইসব গুণাগুণ বাংলাদেশের কোন্ মানুষ নিজের মধ্যে ধারণ করেন? কোনো শিক্ষক? কবি, সাহিত্যিক? সাংবাদিক? সরকারি কর্মচারি-কর্মকর্তা? পুলিশ? পীর?

আমি জানি না।

আমার এক বন্ধু আছে ইনকাম ট্যাক্স অফিসার। খুব ভালো মানুষ। অনেক মোটা অঙ্কের বেতন পান। আদর্শ স্বামী এবং পিতা। তার ছেলেমেয়েরা অনেক ভালো স্কুলে লেখাপড়া করে। স্ত্রী-সন্তানের কোনো চাওয়া আমার বন্ধুটি অপূর্ণ রাখে না। সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে সে যখন অফিস রওনা করে তখন ঘড়ির কাঁটা দুপুর একটার ঘরে পৌঁছে যায়। আবার তিন-চারটা বাজতেই সে বাড়ির দিকে রওনা হয়। তার কোনো সমস্যা হয় না। সম্ভবত অফিসেরও কোনো সমস্যা হয় না। তার বেতন থেকে কখনও একটা টাকাও কাটা যায় না। উল্টো লোকে তার বাড়ি বয়ে এসে টাকা দিয়ে যায়। আর আমার বন্ধুটি আমার আরও আরও বন্ধুদের নিয়ে বাড়ির ছাদে আড্ডা জমান। আমার বন্ধুপত্নী তার স্বামীটি যে বাড়ির বাইরে গিয়ে উল্টোপাল্টা আড্ডায় সময় কাটাচ্ছেন না, এতেই খুশি।

আমার এই বন্ধুটি প্রতিবেশীদের ঈর্ষা, প্রতিবেশী পত্নীদের ঈর্ষা, আমাদের অনেক বন্ধুদেরও ঈর্ষা। কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের ‘হিমু’ চরিত্রটি একবার এক পুলিশ অফিসারকে প্রশ্ন করেছিল, ‘স্যার, আপনার বেতন কত?’

পুলিশ অফিসার ভুরু কুঁচকে কিছুটা অবাক হয়েই জানতে চেয়েছিলেন, ‘কেন?’

জবাবে হিমু একটা হিসেব কষে দেখিয়েছিল। এক প্যাকেট বেনসনের দাম যদি একশ’ টাকা হয় তবে রোজ দুই প্যাকেট হিসাবে ছয় হাজার টাকা শুধু সিগারেটেই খরচ হয়। তারপর ছেলেমেয়ে বউ সংসারের খরচ তো আছেই। তাহলে একজন পুলিশ অফিসার কত টাকা বেতন পান? এখন এক প্যাকেট বেনসন সিগারেটের দাম দু শ’ পঁচাত্তর টাকা। তো দু প্যাকেট হিসাবে মাসিক খরচ ষোল হাজার দু শ’ টাকা। পুলিশের একজন সাব ইন্সপেক্টরের ‘সরকারি বেতন স্কেল-২০১৫’ অনুযায়ী দশম গ্রেডের বেসিক ১৬ হাজার থেকে ৩৮ হাজার ৬৪০ টাকা । আর এএসআইয়ের বেতন হল ১২ হাজার ৫০০ থেকে ৩২ হাজার ২৪০ টাকা।

বিষয়টা দাঁড়াল, পুলিশের এসআই এবং এএসআইয়েরা বেতনের টাকা দিয়ে ধূমপান করেন এবং সত্যবাদিতা, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ, শৃঙ্খলা, মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, সাহসিকতা দিয়ে স্ত্রী সংসার ছেলেমেয়ের খরচ চালান। একথা ঢালাওভাবে অবশ্যই সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে বারো ষোল হাজার টাকা বেতন পাওয়া লোকেরা বেনসন যে ফুঁকবেন না, এই সিদ্ধান্তে আসতে বুদ্ধিজীবী হওয়া লাগে না।

তো ওই পুলিশ অফিসারের বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি অথবা স্ত্রী-সন্তান কী অসৎ হওয়ার কারণে পুলিশ অফিসারকে চরিত্রহীন বলতে পেরেছেন? ভাবতে পেরেছেন কোনোদিন? ভাববেন কি? হিমুর কথা থেকেই পুলিশের উদাহরণটি এল। তো এ প্রশ্নগুলো আসলে আয়ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা রয়েছে বেতনভুক্ত এমন যে কোনো পেশাজীবী ও পরিজনদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। খুব বোরিং লাগছে, না? চলুন একটু অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করি।

চরিত্র বিষয়ক রচনা বলছে, মানুষের চরিত্র গঠনের প্রক্রিয়া মূলত শুরু হয় শিশুকাল থেকেই। শিশুদের মনে যে ছাপ পড়ে তাই সারাজীবনের জন্য স্থায়ী হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকে আমাদের পড়ানো হয়েছে, এই দেশ আমার মা, এই মাটি আমার মা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবাই দেশকে গালাগাল করছেন। কেউ দেশে থাকতে চান না। কোনোক্রমে দেশ ছেড়ে পালাতে পারলেই বেঁচে যান। শুধু তাই নয়, নিজে তো থাকতে চানই না, অপরকেও পালিয়ে যেতে নিরলসভাবে উৎসাহিত করেন। আর যারা বিদেশে অবস্থান করছেন তাদেরকেও দেশে ফিরতে নিরুৎসাহিত করছেন।

ক্লাস সেভেন একবার আমাদের স্কুল থেকে মতিঝিল এলাকার একটা স্কুলে ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিলাম। তো আমাদের ক্লাসের হয়ে কয়েকজন ছেলে খেলেছিল যারা আসলে আমাদের ক্লাসের ছিল না। আমাদের স্পোর্টস টিচারই পুরো ব্যবস্থা করেছিলেন। সেদিন ম্যাচে জেতাটাই মূখ্য হয়ে উঠেছিল। ম্যাচ যে সততার সঙ্গে খেলতে হয় সেটি ছিল উপেক্ষিত। তো সততার প্রতি এই উপেক্ষা যদি কোমলমতি আমাদের চরিত্রে প্রভাব বিস্তার করেই ফেলে তো এর দায় আপনি কার ঘাড়ে চাপাবেন?

ক’বছর আগে কথা, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস একটা শিল্পর পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। অভিভাবকেরাই নাকি পরীক্ষার দুয়েকদিন আগে থেকে প্রশ্নপত্রর জন্য ছুটোছুটি করেন। তারপর ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে পাশ করানোর পর সে অভিভাবকেরা ছেলেমেয়েকে ডাক্তার বানাতে চান, ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চান, চার্টাড অ্যাকাউন্টেন্ট বানাতে চান, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারও বানাতে চান। কিন্তু কখনও রাজনীতিবিদ বানাতে চান না। কেন চান না! অথচ রাজনীতি কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতিই নিয়ন্ত্রণ করে নাগরিকের আমূল জীবন কাঠামো। তাহলে কেন চান না!

বেতনের টাকা দিয়ে ধূমপান করা এবং সত্যবাদিতা, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ, শৃঙ্খলা, মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, সাহসিকতা দিয়ে স্ত্রী সংসার ছেলেমেয়ের খরচ চালানোর যে চর্চা, রাজনীতিবিদরা সেই শিক্ষাটা দেন বলে? কিন্তু এই চর্চা তো প্রায় সকল সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারিই করেন। তাহলে রাজনীতিবিদেরা কী দোষ করল!

কোনো দোষ করে নাই। বিষয় হলো, রাজনীতি যারা করেন তারা মোটামুটি সকল কিছুর উর্ধ্বে উঠে যান। ঈর্ষনীয় হয়ে ওঠেন। আক্ষরিক কোনো কাজ না করেও সীমাহীন সম্পদের মালিক বনে যান। কেননা বাংলাদেশে রাজনীতি করতে গেলে অর্থনীতি জানা থাকা লাগে না, সমাজবিজ্ঞান জানা থাকা লাগে না, রাষ্ট্রবিজ্ঞান জানা থাকা লাগে না, কোনো আদর্শও লাগে না। শুধু রাগী টাইপ হওয়া লাগে; আর সেই রাগ প্রতিপক্ষর ওপর ঝাড়তে পারার যোগ্যতাটা লাগে। সেই যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলেই খুব দ্রুত ফুলে ফেঁপে টাকার কুমির হয়ে যাওয়া যায়। তারপর পত্রিকায় শিরোনাম আসে, কোটিপতি ছাত্রনেতাদের গল্প। শিরোনামহীন এইরকম আরও কত কত যে আছে তার হিসাব কে রাখে? ফলে কোনো বাবা-মায়েরাই সন্তানকে রাজনীতিক বানাতে না চাইলেও দেশে রাজনীতিকের কোনো অভাব আসলে কখনও হয় নি। হবেও না বোধ করি।

এদেশের মানুষের রাজনীতির অভিজ্ঞতা ঋদ্ধ বটে, তবে মধুর নয়। যেহেতু দীর্ঘ সময় ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল, ফলে সবসময়ই রাষ্ট্রর সঙ্গে সাধারণ মানুষের বৈরী সম্পর্ক ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে বিদেশি লোকে, কি ব্রিটিশ আর কি পাকিস্তান। সেকারণে এই বিদেশি লোকেদের জন্যে রাষ্ট্র পরিচালনাকে বাধাগ্রস্ত করা দরকার ছিল। হরতাল, ভাঙচুর ইত্যাদি মানুষ সমর্থন করেছে, পালন করেছে। উদ্দেশ্য ছিল এইসব বিদেশিদের তাড়ানো। তারপর একাত্তর এল। যুদ্ধ হলো। স্বাধীন বাংলাদেশ হলো। কিন্তু হরতাল, ভাঙচুর, রাষ্ট্র অচল করে দেওয়া ইত্যাদি রাজনীতি করা লোকেদের চরিত্রে রয়েই গেল। রাষ্ট্রকে অচল করতে গিয়ে সাধারণ নাগরিকদের যে জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে সেটা ছায়া সরকার পাত্তা দেয় না। ওদিকে মুখে গণতন্ত্রর কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলা রাষ্ট্র পরিচালকেরাও ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তানি শাসকের আদল হয়ে ওঠে।

তবে আমি আশাবাদী মানুষ। নিরাশ হতে আমার ভালো লাগে না। আমি জানি ওপরের ওই সমীকরণের মানুষ তালিকার শীর্ষে থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই ভালোমানুষ। এরা কারও সাতেপাঁচে থাকে না। চুপচাপ নিজেদের কাজ করে যায়। সংসার চালায়। ছেলেপুলে মানুষ করে। মোট কথা হলো, বাংলাদেশটাকে এরাই বাঁচিয়ে রেখেছে। ওপরের সমীকরণের মতো যদি দেশের অর্ধেক মানুষও হতো, তাহলে বাংলাদেশটা থাকত না। ধ্বংস হয়ে যেত। এই মানুষেরাই, এই মানুষদের সন্তানেরাই একদিন বাংলাদেশটাকে তুলে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাবে।

আমি আশাবাদী মানুষ। নিরাশ হতে আমার ভালো লাগে না।


 

Share With:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Start typing and press Enter to search