ঘটনাবহুল ও শোকাবহ আগস্ট আখ্যান


লুৎফুল হোসেন



রোমান প্রজাতন্ত্রের পরিচালক জুলিয়াস সিজারের পালকপুত্র অগাস্টাস সিজার, রোমান সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনকারী প্রথম রোমান সম্রাটের নামে আগস্ট মাসের নামকরণ। এই আগস্ট মাসেই অগাস্টাস রোমান কনসাল হন, তাঁর মৃত্যু এবং শাসনকালের সমাপ্তিও ঘটে এই আগস্ট মাসেই। হয়তো এমন অতীত ধারাবাহিকতার সূত্র ধরেই পৃথিবীর অনেক উল্লেখযোগ্য শুরু এবং শেষের ইতিহাস রচিত হয়েছে এই আগস্ট মাসে।

১৪৩৭ সালের ১৪ আগস্ট মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কার সম্ভবত আগস্ট মাসে ঘটে যাওয়া আধুনিক সভ্যতার প্রথম ইতিবাচক ঘটনা। একই শতকে, ১৪৯২ সালের ৩ আগস্ট ক্রিস্টোফার কলম্বাস স্পেনের পালোস বন্দর থেকে ‘’নিনা’, ‘পিন্টা’ ও ‘সান্তা মারিয়া’ জাহাজত্রয়ী নিয়ে নতুন ভূখণ্ডের সন্ধানে অভিযাত্রা শুরু করেন। পৃথিবীর মানুষ আমেরিকার সন্ধান পায়। এরই সূত্র ধরে ১৫৮৩ সালের ৫ আগস্ট উত্তর আমেরিকায় প্রথম বৃটিশ উপনিবেশ স্থাপিত হয়।

জুলাই মাসে সূত্র দানা বাঁধলেও বলা হয় ৩ আগস্ট ১৯১৪ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। আগস্ট মাসেই জাপান মিত্রশক্তিতে যোগ দেয়। এই বছরের একই মাসে পানামা খাল বানিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয় এবং প্রথম বাষ্পীয় জাহাজ অর্থের বিনিময়ে এই খাল পাড়ি দেয়।

৫ আগস্ট ১৯২১ মোস্তফা কামাল আতার্তুক তুরস্কের শাসক হন। ৫ আগস্ট ১৯২২ আলবার্ট আইনস্টাইন জার্মানি ত্যাগ করে আমেরিকায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। ২ আগস্ট ১৯৩৯ আইনস্টাইন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে চিঠি লেখেন আণবিক বোমার ভয়াবহতা সমপর্কে সতর্ক করে। তিনি লেখেন যে, একটা আণবিক বোমা বহনকারী জাহাজে বিস্ফোরণ ঘটলে গোটা সমুদ্রবন্দর এবং এর আশেপাশের বিপুল এলাকা ধ্বংস হয়ে যাবে। এর ছয় বছর পর এই আগস্ট মাসেই আমেরিকা প্রথম আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে জাপানের বন্দর-শহর হিরোশিমায়।

এই আগস্ট মাসটি তাই সঙ্গত কারণেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাবহুল মাস। ৬ আগস্ট ১৯৪৫ আমেরিকার বি-২৯ বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’ জাপানের বন্দর-শহর হিরোশিমায় আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। হামলায় এক লক্ষ পাঁচ হাজার মানুষ সেই সময় এবং পরে আরো এক লক্ষ মানুষ মারা যায়।

দুদিন পর ৮ আগস্ট জাপান অধিকৃত মাঞ্চুরিয়ায় সৈন্য পাঠিয়ে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে রাশিয়া। এর পরদিন, ৯ আগস্ট জাপানের কোকুরায় বোমা ফেলতে এসে আবহাওয়ার কারণে দৃশ্যমানতা বিঘ্নিত হওয়ায় আমেরিকান বি-২৯ বোমারু বিমান থেকে দ্বিতীয় আণবিক বোমাটি নিক্ষেপ করা হয় জাপানের নাগাসাকি শহরের ওপর। বিস্ফোরণে তখন সত্তর হাজার ও পরে সমধিক মানুষ মারা যায় এই বোমায়। বিশ্ব অবলোকন করে আণবিক বোমা আবিষ্কারের ভয়ঙ্কর ফলাফল, ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয় সভ্যতার এক ভয়াবহতম হত্যাযজ্ঞ। ১৪ আগস্ট শোক স্তব্ধ সম্রাট হিরোহিতো জাপানের আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন, ১৫ আগস্ট তা ঘোষণা করেন। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই আত্মসমর্পণ সমপন্ন হয় ২ সেপ্টেম্বর।

১৯৬১ সালের ১৩ আগস্ট ১০৩ মাইল বা ১৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বার্লিন প্রাচীর স্থাপন শুরু হয়। দীর্ঘ ২৮ বছর পর ১৯৮৯ সালে এই প্রাচীর ভাঙা হয়। ১৯৬২ সালের ৪ আগস্ট বর্ণবাদবিরোধী অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা গ্রেফতার হন দক্ষিণ আফ্রিকা নিরাপত্তা পুলিশের হাতে। ২৭ বছর কারাভোগের পর বৈশ্বিক চাপের মুখে ১৯৯০ সালে তিনি মুক্তি পান।

এই আগস্ট মাসের ৭ তারিখ, ১৯৬৪ সাল, ভিয়েতনামে সশস্ত্র হামলার অনুমতি দেয় মার্কিন কংগ্রেস। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহ ইতিহাস সৃষ্টির সূত্রপাত ঘটে। ১৯৯০ সালের ২ আগস্ট কুয়েতে হামলা করে দখল নেয় ইরাকের সেনাবাহিনী। তেল উৎপাদনে কুয়েতের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড এই আক্রমণের হেতু। পাঁচ দিনের মাথায়, ৭ আগস্ট, সামরিক হস্তক্ষেপের অনুমোদন দেয় প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের মার্কিন সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির যুগাধিকালব্যাপী যুদ্ধদিনের সেই শুরু। এর সূত্র ধরেই বিশ্বজুড়ে নানান অস্থিরতা ও আইএস নামক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের জন্ম।

১৯৪০ সালের ২০ আগস্ট স্ট্যালিনের চররা মেক্সিকোতে পলাতক সোভিয়েত কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা ট্রটস্কিকে হত্যার চেষ্টা করে। আহত ট্রটস্কি পরদিন ২১ আগস্ট মারা যান। এর অর্ধশতাব্দী পর ১৯৯১ সালের ১৯ আগস্ট মিখাইল গর্বাচেভের পতন হয় এবং রাশিয়াতে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।

২১ আগস্ট ১৯৮৩ দীর্ঘদিন অন্তরীণ থাকার পর দেশে ফিরে ম্যানিলা বিমানবন্দরে নেমেই খুন হন ফিলিপিন রাজনীতিবিদ একুইনো জুনিয়র। ১৭ আগস্ট ১৯৮৮ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ পাক প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হককে নিয়ে বাহওয়ালপুর থেকে উড্ডয়নের পরপরই বিমান ভূপাতিত হয়ে মারা যান সবাই। ১৮ আগস্ট ১৯৪৫ নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে বহনকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নেতাজি মারা যান তাইপে-তে। ১৭ আগস্ট ১৯৪৫ ইন্দোনেশিয়া ওলন্দাজ ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত হয়। লৌহমানব সুকর্ণ স্বাধীন ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান হন।

এই আগস্ট মাসের ৭ তারিখে (১৯৪১) মারা যান বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯৬২ সালের ৫ আগস্ট মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান মেরিলিন মনরো। ১৯৭৭ সালের ১৬ আগস্ট মারা যান এলভিস প্রিসলী। তিন অঙ্গনের তিন মহারথীর প্রয়াণ আগস্ট মাসটির শোকের মাত্রা আরও বাড়িয়েছে নিঃসন্দেহে।

১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিকে ঘিরে দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটে। কয়েকদিন ধরে চলমান এই দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। এর জের ধরে ধর্মীয় বিভেদ ভিত্তিক সন্ত্রাস স্থায়ী হয়ে যায় ভারতের ভূখণ্ডে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রাতে ভারত বিভক্ত হয়ে দুটি পৃথক রাষ্ট্র গঠিত হয়। ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে পৃথিবীর বুকে।

নতুন রাষ্ট্র হসেবে পাকিস্তান স্বাধীন হলে পরে পশ্চিম পাকিস্তান লাভবান হলেও পূর্ব পাকিস্তানের ভাগ্যের কোনো পরবর্তন ঘটে নি। ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচনে জয়লাভ করেও পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসতে না দিলে বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম মোড় নেয় স্বাধীনতা যুদ্ধে। বাঙালির অগ্রযাত্রা রুখে দিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। ১১ আগস্ট ১৯৭১ ইয়াহিয়া খান গোপন ট্রাইবুনালে বিচারের মুখোমুখি করে মুজিবকে। এই ট্রাইবুনাল পরবর্তীতে তাঁকে মৃত্যুদ– দেয়। কিন্তু এই দণ্ড কার্যকর করবার সাহস করে উঠতে পারেনি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, পাকিস্তানিরা যা পারে নি শেষ পর্যন্ত তা সংঘটিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতেই। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ ষড়যন্ত্রকারী পাক হানাদারদের দোসররা শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করে। শিশু রাসেলকেও রেহাই না দেয়া সেই হত্যাযজ্ঞে বেঁচে যান মুজিবের দুই কন্যা। তাঁদেরই একজন ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০৪ সালে পুনরায় মুজিব পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার চেষ্টায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে ন্যাক্কারজনক গ্রেনেড হামলা হয়। হামলায় মারা যান ২২জন শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা।

১৯৭১ সালের ২১ আগস্ট শাহাদাত বরণ করেন বীর শ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহামানের। ১৬১৩ সালের এই দিনে ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন ইসলাম খাঁন চিশতীর মৃত্যু হয়। ১৬১৩ সালের এই একই দিনে ঈসা খাঁর মৃত্যু। ১৬৩৬ সালের ২৭ আগস্ট এক সময় যার নামে ঢাকার নাম হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর, সেই মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যু হয়।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। ওইদিন সকাল সাড়ে বেলা ১১-১১:৩০ এর মধ্যে মধ্যে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে একমাত্র মুন্সিগঞ্জ জেলা ছাড়া ৬৩ জেলার প্রেসক্লাব, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ঢাকার ৩৪টিসহ সাড়ে ৪শ’ সপটে প্রায় ৫শ’ বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। এই হামলায় নিহত হন ২ জন এবং আহত হয় দু’শতাধিক মানুষ।

দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে দুই ছাত্র-ছাত্রী নিহত ও ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হয় ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই। এই দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে নিহত দুই শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে চলমান এই ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ গণবিক্ষোভ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নেয়া এক অভূতপূর্ব ঘটনা, যা এর সাফল্যবঞ্চিত হয় স্বার্থান্বেষী সুযোগসন্ধানী রাজনীতির অপশক্তি একে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টায় কলঙ্কিত করলে।

ইতিহাসে বারবার এই আগস্ট মাস ফিরে ফিরে এসেছে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার নজির রেখে যেতে। কেন যেন এই আগস্ট মাসেই এমন সব ঘটনা ঘটবার নিয়তি সৃষ্টি হয়। আগস্ট এলেই শঙ্কার এক হিমস্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে। এমন সময়ের উল্টোস্রোত থামিয়ে আমরা কবে বেগবান হবো সত্য সঠিক ও লব্ধ অর্জনের পথে কে জানে!


লেখক: কবি ও কথাকার                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                    ৩০ জুলাই ২০২১

Share With:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Start typing and press Enter to search