আমাদের একাত্তরের বন্ধুরা

শাহ্ জে. চৌধুরী


কোনো যুদ্ধই একলা লড়া যায় না। যুদ্ধে যেমন প্রতিপক্ষ থাকে, তেমনভাবে থাকে মিত্রপক্ষ। মিত্র তো বন্ধু। একটি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের সময় তার মিত্রদের মিত্রতার ধরণ এবং অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসে বিদেশী মিত্রদের ভূমিকার কথা উদারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রয়োজনের সময় তাদের অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের এ সকল বন্ধুদের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

২০১১ সালে বাংলাদেশ ৬৫০ জন বিদেশী বন্ধু এবং প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা তৈরি করে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত ২১টি দেশের ৩৩৮ জনকে সাতটি ধাপে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২২৫ জন ভারতীয়, ২৯ জন আমেরিকান, ১৭ জন পাকিস্তানি, ১৩ জন ব্রিটিশ, ১১ জন রাশিয়ান, ৯ জন নেপালি, ৮ জন জাপানি ও ২ জন ফরাসি। পুরস্কারের ক্যাটাগরি ছিল তিনটি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা বা বাংলাদেশ ফ্রিডম অনার, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা বা বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়র অনার, এবং বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু সম্মাননা বা ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়র অনার।

এ বছর বাংলাদেশের জাতীয় বিজয় দিবসের সুবর্ণ জয়ন্তীতে সেই সব বিদেশী বন্ধুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনকে সশ্রদ্ধ স্মরণ করা হয়েছে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একাত্তরে মুক্তির সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।


বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক দখল প্রত্যাহার করতে সরকারি সহায়তা দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম কারা প্রায় এক কোটি উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। শরণার্থীদের জন্য তিনি ভারতের পূর্ব সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও রসদ জুগিয়েছেন।

ভারতীয় সেনাবাহিনী একাত্তরের অক্টোবর থেকে পাকিস্তানি সীমান্ত চৌকিতে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে সক্রিয় অংশ নিয়েছিল। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সেনাবাহিনী কেবল সীমান্ত রক্ষার জন্যই নয়, পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে দশ মাইল পর্যন্ত আক্রমণাত্মক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধী পূর্ব পাকিস্তানে পাক সেনাদের বর্বরতা বন্ধ করতে বিশ্ব নেতাদের হস্তক্ষেপ ও পাকিস্তানকে চাপ দেয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। পরে তিনি নভেম্বরের মাঝামাঝি পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তে সামরিক অভিযান আরো বাড়ানোর নির্দেশ দেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমান্ড গঠিত হয় যার প্রধান ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা।

৪ ডিসেম্বরে চুড়ান্ত যৌথ আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই সামরিক পদক্ষেপ মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে।
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে ইন্দিরা গান্ধী সংসদে ঘোষণা করেন।

যারা বিশ্বকে ১৯৭১ সালের আসল চিত্রটা দেখিয়ে, বিশ্ব জনমতকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঘুরিয়ে দিতে সাহায্য করেছিল, অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাদের মধ্যে একজন। পাকিস্তান সরকার করাচির দ্য মর্নিং নিউজের সহকারী সম্পাদক মাসকারেনহাসকে পাকিস্তানি প্রজ্ঞাপন প্রচারের জন্য পূর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়েছিল। পাকিস্তানি নৃশংসতায় আতঙ্কিত হয়ে গণহত্যার ছবি নিয়ে ১৮ মে লন্ডনে পালিয়ে যান। ১৩ জুন ১৯৭১ লন্ডনের সানডে টাইমসে ‘জেনোসাইড’ শিরোনামে ১৬ কলাম (২-পৃষ্ঠার) প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে তাতে বিশ্ব হতবাক হয়ে পড়ে। সেই রিপোর্টে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতা, ভারতে উদ্বাস্তুদের আশ্রয়, দুর্ভিক্ষে অগণিত মানুষের মৃত্যু, হাজার হাজার নারী ধর্ষণ, শিশু হত্যা সব ফুটে উঠেছিল।

বিবিসি নিউজের মার্ক ড্রামেট, ২০১১ সালের বিজয় দিবসের নিবন্ধে এটিকে ‘ইতিহাস পরিবর্তনকারী নিবন্ধ’ বলে অভিহিত করেন। বিবিসি লিখেছে, ‘মাসকারেনহাসের প্রতিবেদন যুদ্ধের অবসানে যে ভূমিকা রেখেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটি বিশ্ব জনমতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দিতে এবং ভারতকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, মাসকারেনহাসের নিবন্ধ তাকে ‘ভারতের সশস্ত্র হস্তক্ষেপের জন্য প্রস্তুত করতে’ পরিচালিত করেছিল।

তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতা তুলে ধরে দুটি বই প্রকাশ করেন, যার শিরোনাম: ‘দ্য রেপ অফ বাংলাদেশ’ এবং ‘বাংলাদেশ: অ্যা লিগ্যাসি অব ব্লাড’।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল জ্যাক ফারজ রাফায়েল জ্যাকব ওরফে জেএফআর জ্যাকব একাত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ ছিলেন। যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করতে জ্যাকবের ‘ওয়ার অব মুভমেন্ট’ পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। এই পরিকল্পনায় মাত্র ১৫ দিনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঢাকায় সফল অনুপ্রবেশ করে। তার পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানের কমান্ড এবং যোগাযোগ অবকাঠামোকে অকেজো করে মধ্যবর্তী শহরগুলোকে এড়িয়ে ঢাকায় পৌঁছানোর জন্য সেকেন্ডারি রুট ব্যবহার করা। জ্যাকব একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক ‘আত্মসমর্পণের দলিল’ বহন করেছিলেন এবং প্রতিপক্ষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজীকে ৩০ মিনিটের মধ্যে শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করেছিলেন।

জেনারেল জ্যাকব, নিয়াজী এবং ঢাকায় অবস্থানরত তার ২৬ হাজার সৈন্যকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে জনসমক্ষে আত্মসমর্পণ করান।

 

একাত্তরে যখন পাকিস্তানি শাসকরা বিদেশী সাংবাদিকদের জোর করে বের করে দিচ্ছিল, কেবলমাত্র ব্রিটিশ রিপোর্টার সাইমন ড্রিং তখন পালিয়ে গিয়ে গণহত্যার সাক্ষী হয়ে থাকেন। কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে প্রায় দু শ’ বিদেশী সাংবাদিককে আটকে রেখেছিল যাতে তারা নৃশংসতার সাক্ষী হতে না পারে। পরে তাদের করাচি পাঠানো হয়।

দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের রিপোর্টার ড্রিং’কে পূর্ব পাকিস্তানের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি কভার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি ৬ মার্চ ঢাকায় এসে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণ প্রত্যক্ষ করেন।

পঁচিশে মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন বিশ্ব মিডিয়াকে সংবাদ সংগ্রহ থেকে বিরত রাখতে চাই, তখন ড্রিং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বত্রিশ ঘন্টারও বেশি সময় লুকিয়ে থেকে ছিলেন। ২৭ মার্চ কারফিউ তুলে দিলে সামরিক টহল এড়িয়ে তিনি হোটেল ত্যাগ করেন। এরপর শহর ঘুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে গণহত্যার আলামত সংগ্রহ করেন। পরে পশ্চিম পাকিস্তানের একটি ফ্লাইটে ব্যাংককে পৌঁছানো পর্যন্ত নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে বেশ কয়েকবার থামিয়েছিল। কিন্তু যেভাবেই হোক তার নথিপত্রগুলো অক্ষত থেকে গিয়েছিল। ড্রিং তার বিখ্যাত প্রতিবেদন ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’ লিখেছেন যা বাংলাদেশে নৃশংস গণহত্যার প্রথম বিবরণ হিসেবে একাত্তরের ৩০ মার্চ দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল।

’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ডাচ অস্ট্রেলিয়ান উইলিয়াম এএস ওডারল্যান্ডকে বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু বলা হয়। তিনিই একমাত্র বিদেশী নাগরিক যিনি বাংলাদেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বীরত্ব পুরস্কার বীর প্রতীকে ভূষিত হয়েছেন।

ওডারল্যান্ড ১৯৩৪ সালে বাটা শু কোম্পানিতে শু-শাইনার হিসাবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৪০ সালে চাকরি ছেড়ে দেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ডাচ সেনাবাহিনীর গেরিলা কমান্ডো হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ওডারল্যান্ড সত্তর দশকের শেষ দিকে বাটা শু কোম্পানির প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে প্রথম ঢাকায় আসেন। কয়েক মাসের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধের মুখোমুখি হয়ে ওডারল্যান্ড নিজের প্রাক্তন সৈনিক সত্তাকে আবিষ্কার করেন।

শুরুতে তিনি গোপন গোয়েন্দা সদস্য হিসেবে কাজ করতেন। বিদেশী হিসেবে সেনা সদরে তার প্রবেশাধিকার সহজ ছিল। তিনি দখলদার সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা ও কর্মকা-ের কথা মুক্তিযোদ্ধাদের জানিয়ে দিতেন। গেরিলা কমান্ডো হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার অভিজ্ঞতার কারণে তিনি সেক্টর-২ এর একটি গেরিলা শাখার সক্রিয় সদস্য হন। তিনি বাটা জুতা কারখানাসহ টঙ্গীর বিভিন্ন গোপন ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতেন।

এ ছাড়াও দখলদার বাহিনীর নৃশংসতা ও গণহত্যার বিভিন্ন ছবি সংগ্রহ করে তিনি বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে পাঠান, যেগুলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে সাহায্য করেছিল।

সিডনি এইচ শ্যানবার্গই প্রথম বিদেশী সাংবাদিক যিনি একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার খবর বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের দক্ষিণ এশীয় সংবাদদাতা ছিলেন। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হওয়ার পর গণহত্যাসহ মর্মান্তিক কাহিনী পাঠিয়ে বিশ্বকে সতর্ক করেছিলেন। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর রাতের বর্ণনায় লিখেছেন, যতবারই হোটেলে সংবাদকর্মীরা অফিসারদের কাছে তথ্য জানতে চেয়েছিল, তাদেরকে বাধা দেওয়া হয়েছিল। কূটনৈতিক মিশনে পৌঁছানোর সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। একদল সংবাদকর্মী কথা বলার জন্য সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় এবং একজন ক্যাপ্টেন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সে তাদেরকে পিছু হটতে এবং বিল্ডিংয়ে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এবং চিৎকার করে বলে, ‘তোমাদের আমিই সামলাতে পারি। যদি আমি আমার নিজের লোকদের মারতে পারি তবে আমি তোমাদেরকেও মেরে ফেলতে পারি।’

তিনি ছিলেন হোটেলে বন্দী থাকা বিদেশী সাংবাদিকদের একজন যিনি ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটের মধ্যে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছিলেন। পরে কলকাতা ও নিউ ইয়র্ক থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের ওপর বর্বরতা উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকেন। একাত্তরের জুনে শ্যানবার্গ দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণে প্রতিবেদন লিখেছেন। একারণে ’৭১ সালের ৩০ জুন পাকিস্তান তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে।

স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি একাত্তর সালে বিবিসির ভারতীয় সংবাদদাতা ছিলেন। তিনি ছিলেন বিবিসির প্রাক্তন নতুন দিল্লি ব্যুরোর প্রধান এবং বিশ বছর ধরে ওই পদেই ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন পাকিস্তানি জান্তা নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে সরকারি প্রচার চলত, তখন বিবিসি রেডিওতে মার্ক টালির যুদ্ধের কভারেজ ছিল জনগণের প্রামাণিক তথ্যের প্রধান উৎস। তিনি বিবিসির জন্য যুদ্ধের খবরগুলো বিস্তারিত কভার করেছেন এবং তার সঙ্গে নথিভুক্ত করার সুযোগও পেয়েছিলেন।

 

 

 

টেড কেনেডি নামে পরিচিত এডওয়ার্ড মুর কেনেডি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী সিনেটরদের একজন। তিনি একাত্তরে পাকিস্তানের সমর্থক নিজ সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন করেছিলেন। পরিস্থিতি পরিদর্শনের জন্য কেনেডি ভারতে যান। যুদ্ধের কারণে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করতে না পারায় ভারতের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে সিনেটের শরণার্থী বিষয়ক বিচার বিভাগীয় কমিটির কাছে একটি কঠোর প্রতিবেদন দেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘পঁচিশে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সৃষ্ট পর্যায়ক্রমিক সন্ত্রাসী অভিযান – এবং পরিণতিতে গণহত্যা – এর চেয়ে বেশি স্পষ্ট, বা আরও সহজ দলিল আর কিছু হতে পারে না… ‘এই সমস্ত কিছুই ইসলামাবাদের সামরিক আইনের অধীনে আদেশকৃত, অনুমোদিত এবং বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পূর্ব বাংলার মানুষ ও রাজনীতির এই করুণ পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের প্রতি আমেরিকার ব্যাপক সমর্থন হলো দুষ্কর্মে অংশগ্রহণ।’

যদিও নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন জারি রেখেছিল, কিন্তু কেনেডি ছিলেন অবিচল। এর ফলে, পাকিস্তানে অস্ত্র বিক্রি নিষিদ্ধ করে একটি বিল মঞ্জুর করা হয়।

 

রক ব্যান্ড বিটলসের লিড গিটারিস্ট, জর্জ হ্যারিসন। একাত্তরের জুনে রবিশঙ্কর বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য একটা কনসার্ট করতে চান বলে জর্জকে জানান। এরপর রবিশঙ্কর মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত বিভিন্ন পত্রিকা ও সংবাদগুলো পাঠান জর্জের কাছে। জর্জ তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আই মি মাইন’-এ লিখেছেন, ‘বিষয়টা একটু একটু করে বুঝতে শুরু করলাম। আমার মনে হলো, এ ব্যাপারে আমার তাকে সাহায্য করা উচিত।’ তিনি লিখেছেন, ‘এভাবেই জড়িয়ে গেলাম। পরে যা ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠে।’

সাবেক বিটলস লিড গিটারবাদক জর্জ হ্যারিসন এবং ভারতীয় সেতারবাদক রবিশঙ্কর ১ আগস্ট ১৯৭১, রবিবার অপরাহ্নে নিউ ইয়র্ক সিটির ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে দুটি বেনিফিট কনসার্ট, দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আয়োজন করে। এতে অংশ নিয়েছিলেন বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীদের এক বিশাল দল। এদের মধ্যে বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, জর্জ হ্যারিসন, বিলি প্রিস্টন, লিওন রাসেল, ব্যাড ফিঙ্গার এবং রিঙ্গো রকস্টার ছিলেন উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৪০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে এই কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। কনসার্টে সংগৃহীত আড়াই লক্ষ ডলার ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের জন্য দেয়া হয়েছিল।

কনসার্টের মূল আকর্ষণ ছিলেন বব ডিলান ও জর্জ হ্যারিসন। অনুষ্ঠানের শেষ পরিবেশনা ছিল জর্জ হ্যারিসনের অবিস্মরণীয় গান ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’। গানটি লেখা ও সুর জর্জের নিজের। যুদ্ধ পীড়িত বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সকরুন আহ্বান ছিল গানের মূল কথা। এটি ছিল মানবতার কল্যাণে আয়োজিত সর্ব প্রথম এবং সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠান।

আমেরিকান কবি আরউইন অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ লিখেছিলেন একাত্তর সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ১৫২ লাইনের এ কবিতায় মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের কঠিন সংগ্রামকে চিত্রিত করেছিল। গিন্সবার্গ একাত্তরে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বাংলাদেশের যশোর ও ভারতের কলকাতা সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের পর কবিতাটি লেখেন। তিনি বাংলাদেশী উদ্বাস্তুদের দুর্ভোগের দিকে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে একাত্তরের ২০ নভেম্বর নিউ ইয়র্কের সেন্ট জর্জ চার্চে কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন।

কবিতার গভীরতা দেখে বন্ধু বব ডিলান এটিকে একটি গানে পরিণত করেন। এরপর সেটি বাংলাদেশি শরণার্থীদের সাহায্যে তহবিল সংগ্রহে কনসার্টে পরিবেশন করেন।

 

 

আঁদ্রে ম্যালরোঁ বাংলাদেশের অন্যতম প্রিয় বন্ধু যিনি সশরীরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে ফ্রান্সের অবস্থান নেয়ায় ম্যালরোঁর ভূমিকা ছিল।

একাত্তরের জুলাইয়ে ভারতের অহিংস আন্দোলনের নায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণ বাংলাদেশে যুদ্ধের বর্বরতা সম্পর্কে বিশ্বকে অবহিত করতে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের জন্যে আঁদ্রে ম্যালরোঁর সাথে যোগাযোগ করেন। বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হানও বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী মুক্তিযুদ্ধ পরিষদের পক্ষ থেকে ম্যালরোঁকে সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান। আমন্ত্রণের প্রতিক্রিয়ায় ম্যালরোঁ লিখেছিলেন: ‘বাংলাদেশের যোদ্ধারা এখন গুরুত্বপূর্ণ। হয় এটি পাকিস্তানের সাথে কঠিন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে অথবা এটি তার গেরিলাদের সুসংগঠিত করবে এবং পাকিস্তান পরাজিত হবে।’

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা বন্ধে ম্যালরোঁ রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সনকেও একটি চিঠি লিখেছিলেন।

এছাড়া তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিপীড়িত জনগণের জন্য লড়াই করতে ম্যালরোঁ একটি আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন।

১৯৭৩ সালের ২৩ – ২৪ এপ্রিল, বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করেন।

Share With:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Start typing and press Enter to search